
মো: রুবেল মোল্লা, মহিপুর (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি:
দেশের প্রচলিত আইন ও বিচারব্যবস্থার বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক দলের দলীয় কার্যালয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়ে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। উপজেলার লতাচাপলী ইউনিয়ন বিএনপির অফিসিয়াল প্যাডে জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের নিষ্পত্তির জন্য দুই পক্ষকে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দিয়ে একটি নোটিশ জারির ঘটনা সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমের সঙ্গে ফৌজদারি ও দেওয়ানি বিরোধ নিষ্পত্তির এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ইতিপূর্বে প্রকাশ্যে আসা লতাচাপলী ইউনিয়ন বিএনপি'র দলীয় প্যাডে তৈরি একটি নোটিশে জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নোটিশে বাদী হিসেবে মো. আ. আবুল কালামের নাম উল্লেখ রয়েছে। তাঁর পিতা মৃত আ: রহমান আকন। ঠিকানা লক্ষ্মীপাড়া, ডাকঘর কুয়াকাটা, থানা মহিপুর, উপজেলা কলাপাড়া, জেলা পটুয়াখালী।
অন্যদিকে বিবাদী হিসেবে মো. রুহুল আমিন, মো. বাবুল ও মো. ইব্রাহিমসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের পিতা মৃত এজেম্বার আলী মুন্সী। তাঁদের ঠিকানাও লক্ষ্মীপাড়া, কুয়াকাটা, মহিপুর, কলাপাড়া, পটুয়াখালী বলে নোটিশে উল্লেখ রয়েছে।
নোটিশের বিবরণ অনুযায়ী,বাদী জমিজমা-সংক্রান্ত বিষয়ে পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্যের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পরে সংসদ সদস্য বিষয়টি সমাধানের জন্য লতাচাপলী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতিসহ তিনজনকে দায়িত্ব দেন বলে নোটিশে দাবি করা হয়েছে।
এতে অভিযোগের সুষ্ঠু সমাধানের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, সাক্ষী ও প্রমাণসহ লতাচাপলী ইউনিয়নের লক্ষ্মী এলাকায় লতাচাপলী ইউনিয়ন বিএনপি'র সাধারণ সম্পাদক সেলিম হাওলাদার বাড়ির বৈঠক খানায় উপস্থিত থাকার জন্য বলা হয়েছে । উপস্থিত না হলে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও উক্ত নোটিশে উল্লেখ রয়েছে। নোটিশে স্বাক্ষরকারী হিসেবে লতাচাপলী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. মহিউদ্দিন মুসুল্লী সুলতান এর নাম রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।
তবে নোটিশে উল্লিখিত তারিখ ও সময়ের অংশে অস্পষ্টতা রয়েছে। সেখানে ৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে শালিস বৈঠক উল্লেখ করা হয়েছে এবং নোটিশটি ৩ জুলাই ২০২৬ তারিখ জারি করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংসদ সদস্যের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
দলীয় প্যাডে নোটিশ জারি করে বিরোধ নিষ্পত্তি করা ও উভয় পক্ষ উপস্থিত না হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার দলীয় নেতৃবৃন্দের এখতিয়ার কতটুকু এ প্রশ্ন স্থানীয় সুশীল সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের ও বিজ্ঞ আইনজীবীদের।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, জমির মালিকানা, দখল, সীমানা ও অন্যান্য দেওয়ানি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আদালতসহ নির্ধারিত আইনগত ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যদিকে পক্ষগুলোর সম্মতি থাকলে সামাজিকভাবে আপস-মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তবে কোনো রাজনৈতিক দলের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক কিংবা অন্য কোনো নেতার পদধারী পরিচয় দিয়ে নিজে থেকেই আদালতের মতো বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ ও প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা রাষ্ট্র দেয় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক বা রাজনৈতিক পর্যায়ে বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগ এবং আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত দেওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। উভয় পক্ষের স্বেচ্ছায় বা সম্মতিতে আপসের উদ্যোগ নেওয়া এক বিষয়। আর কাউকে বাধ্য করা বা অনুপস্থিতির কারণে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়া আরেক বিষয়। কোনো নোটিশে এ ধরনের বক্তব্য থাকলে তার আইনগত ভিত্তি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির এখতিয়ার যাচাই করা জরুরি।
তবে সংশ্লিষ্ট নোটিশের ভাষা ও প্রেক্ষাপট যাচাই না করে একে সরাসরি বেআইনি ঘোষণা করাও সমীচীন নয়। নোটিশটি কেবল সামাজিক মীমাংসার আহ্বান, নাকি কোনো কর্তৃত্বের ভিত্তিতে বাধ্যতামূলক নির্দেশ দেওয়ার চেষ্টা—তা নির্ধারণে পূর্ণাঙ্গ নথি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য প্রয়োজন।
ইতিমধ্যে কুয়াকাটা পৌর বিএনপি'র সাধারণ সম্পাদকের এমন একটি নোটিশ জারির ফলে দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কার্যকলাপের দরুন জেলা বিএনপি কর্তৃক তার দলীয় পদ স্থগিত করা হয়েছে এবং দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কার্যকলাপের জন্য কলাপাড়া উপজেলা বিএনপি'র সাধারণ সম্পাদকের পদ জেলা বিএনপি কর্তৃক তার দলীয় পদ স্থগিত করা হয়েছে। জেলা বিএনপি নেতৃবৃন্দের নজরে এসেছে কতিপয় দলীয় পদধারী নেতারা রাজনৈতিক দলের দলীয় প্যাড ব্যবহার করে ব্যক্তিগত বিরোধের নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি পুনরায় আলোচনায় এসেছে।যার দরুন জেলা বিএনপি নেতৃবৃন্দ সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে যাচাই বাছাই করে দলীয় শৃঙ্খলা বিরোধী নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
স্থানীয়ভাবে বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগ অনেক সময় দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু এ ধরনের উদ্যোগ যেন কোনো পক্ষের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, চাপ সৃষ্টি কিংবা প্রচলিত বিচারব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, সে বিষয়ে সতর্কতা জরুরি।
সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য ও নোটিশের সত্যতা যাচাই করে বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগ থাকলেও তা যেন দেশের প্রচলিত আইন, নাগরিক অধিকার ও ন্যায়বিচারের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়—এটাই প্রত্যাশা।





























