
ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন টাঙ্গাইলের সোহেল রানা। সেই স্বপ্নের পথে দালালকে দিয়েছিলেন প্রায় ১৫ লাখ টাকা। সার্বিয়া, হাঙ্গেরি ও অস্ট্রিয়া হয়ে ইতালিতে যাওয়ার সময় মানব পাচারকারীদের হাতে পড়েন তিনি। ভয়াবহ নির্যাতনে গুরুতর আহত হয়ে প্রায় দুই বছর পর যখন দেশে ফিরলেন, তখন তাঁর হাতে ছিল না কোনো অর্থ, শরীরে ছিল কোমর ও পায়ের জটিলতা, আর মাথার ওপর প্রায় ১০ লাখ টাকার ঋণ।
এমন পরিস্থিতিতে সোহেলের পরিবারের পাশে দাঁড়ায় ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের ‘প্রত্যাশা-২’ প্রকল্প। কাউন্সেলিং, চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তার ধারাবাহিকতায় ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ান তিনি। এখন টাঙ্গাইল সদর উপজেলার সাবালিয়া গ্রামে তাঁর নিজের একটি দোকান—‘সোহেল স্টোর’। মুদি পণ্যের পাশাপাশি সেখানে রয়েছে ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফারের ব্যবস্থা। দোকান থেকে প্রতি মাসে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় করছেন সোহেল।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টার দিকে সোহেলের এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প দেখতে তাঁর দোকান পরিদর্শনে যান টাঙ্গাইল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন মিয়া। এ সময় তিনি সোহেলের বর্তমান ব্যবসা ও অর্থনৈতিক পুনরেকত্রীকরণের বিষয়ে খোঁজ নেন।
দুঃসময়ে পাশে ব্র্যাক:
২০২৫ সালের মে মাসে দেশে ফেরার পর সোহেল যখন শারীরিক অসুস্থতা ও ঋণের চাপে দিশেহারা, তখন একটি উঠান বৈঠকের মাধ্যমে তাঁর পরিবার ব্র্যাকের ‘প্রত্যাশা-২’ প্রকল্পের কথা জানতে পারে।
প্রকল্পের সহায়তায় প্রথমে সোহেলকে সাইকোসোশ্যাল ও ফ্যামিলি কাউন্সেলিং দেওয়া হয়। এরপর তাঁর শারীরিক সমস্যার চিকিৎসার উদ্যোগ নেওয়া হয়। টাঙ্গাইলের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অপারেশনের ব্যবস্থা করে প্রকল্পটি।
চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে ওঠার পর্যায়ে তাঁকে দেওয়া হয় উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও আর্থিক সাক্ষরতা প্রশিক্ষণ। কীভাবে ব্যবসা শুরু করতে হবে, পুঁজি কীভাবে ব্যবহার করতে হবে এবং ব্যবসার আয়-ব্যয়ের হিসাব কীভাবে রাখতে হবে—এসব বিষয়ে ধারণা পান তিনি।
এরপর প্রকল্পের আর্থিক সহায়তায় সাবালিয়ায় শুরু করেন ‘সোহেল স্টোর’। ব্যবসা শুরুর জন্য তিনি পেয়েছেন ৮৬ হাজার ২০০ টাকা এবং চিকিৎসার জন্য পেয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার টাকা সহায়তা।
সোহেল বলেন, দেশে ফেরার পর তিনি খুব অসহায় অবস্থায় ছিলেন। চিকিৎসা ও ব্যবসা শুরু—দুটিই তাঁর জন্য কঠিন ছিল। ব্র্যাকের ‘প্রত্যাশা-২’ প্রকল্পের সহায়তা না পেলে এই অবস্থায় ঘুরে দাঁড়ানো তাঁর জন্য কঠিন হতো।
শুধু সোহেল নন, আরও অনেকের পাশে:
ইউএনও শাহীন মিয়া বলেন, টাঙ্গাইল অভিবাসী অধ্যুষিত জেলা। বিদেশে গিয়ে নানা কারণে ব্যর্থ, অসুস্থ বা বিপর্যস্ত হয়ে অনেকে দেশে ফেরেন। তাঁদের আবার সমাজ ও অর্থনীতির মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, সরকারের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্র্যাকের সহায়তায় ‘প্রত্যাশা-২’ প্রকল্প বিদেশফেরত মানুষদের পুনরেকত্রীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত এই প্রকল্পের আওতায় ৩১৭ জন বিদেশফেরত মানুষকে প্রায় ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও আর্থিক সাক্ষরতা প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ট্রমা কাটিয়ে উঠতে ১৬১ জনকে সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলিং এবং ২০ জনকে প্রায় ৬ লাখ টাকার চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে।
ইউএনও শাহীন মিয়া বলেন, সঠিক দিকনির্দেশনা ও সহযোগিতা পেলে প্রবাসফেরত মানুষ শুধু নিজেরাই স্বাবলম্বী হতে পারেন না, এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখতে পারেন। ইতালি থেকে ফেরা সোহেল রানা ‘প্রত্যাশা-২’ প্রকল্পের মাধ্যমে সফল পুনরেকত্রীকরণের একটি উদাহরণ।
নিরাপদ অভিবাসনেও সচেতনতা:
ব্র্যাকের এই উদ্যোগ শুধু বিদেশফেরত মানুষের পুনর্বাসন বা ব্যবসা দাঁড় করানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দালালের প্রলোভনে পড়ে মানুষ যেন অবৈধ পথে বিদেশে গিয়ে প্রতারণা ও পাচারের শিকার না হন, সে বিষয়েও সচেতনতা তৈরির কাজ করছে প্রকল্পটি।
ইউএনও শাহীন মিয়া বলেন, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। ব্র্যাকের ‘প্রত্যাশা-২’ প্রকল্প এ ক্ষেত্রেও কাজ করছে।
সোহেলের জীবনের গল্পে তাই দুটি দিক পাশাপাশি উঠে আসে—অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার ঝুঁকি এবং দেশে ফিরে সহায়তা পেলে নতুন করে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা। ব্র্যাকের ‘প্রত্যাশা-২’ প্রকল্পের সহায়তায় সেই দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিয়েছেন সোহেল।
পরিদর্শনকালে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের অ্যান্টি-ট্রাফিকিং ক্যাম্পেইন ম্যানেজার শাহনাজ পারভীন, ডেপুটি ম্যানেজার আরিফুল ইসলাম, টাঙ্গাইলে ব্র্যাকের ডিস্ট্রিক্ট কোঅর্ডিনেটর সরকার হাসান ওয়াইজ, মাইগ্রেশন অ্যান্ড রিইন্টিগ্রেশন সাপোর্ট সেন্টারের কো-অর্ডিনেটর এস এম তরিকুল ইসলামসহ ব্র্যাকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।




























