
গাজী হাবিব, সাতক্ষীরা: সাতক্ষীরাতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে নারী মাদককারবারী ও মাদকাসক্তের সংখ্যা। ভারত সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরায় মাদকের ভয়াল নেটওয়ার্ক বিস্তারে যুক্ত হয়েছে এক মারাত্মক নতুন মাত্রা। একই সাথে বাড়ছে সীমান্ত পার করে দেশের অভ্যন্তরে মাদকের চালান পৌঁছে দিতে পাচারকারী চক্রগুলো এখন ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে নারীদের। ভৌগোলিক অবস্থান, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও দরিদ্রতার কারণে সাতক্ষীরা অঞ্চল এখন মাদক চোরাচালানের প্রধান রুটগুলোর একটি।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সাতক্ষীরা থেকে খুলনা ও যশোরমুখী রুটগুলোতে নারী বাহকদের উপস্থিতি দিন দিন বাড়ছে। চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি কালিগঞ্জের ভাড়াশিমলা থেকে ৯৮৩ বোতল ফেনসিডিলসহ ইয়াসমিন জাহান (২২) নামে এক তরুণীকে আটক করে র্যাব ও বিজিবির যৌথ দল। এর কিছুদিন পর ফেব্রুয়ারিতে সাতক্ষীরা থেকে যশোরগামী বাসে তল্লাশি চালিয়ে ১,০০০ পিস ইয়াবাসহ আটক করা হয় নাসিমা বেগম (৪৫) নামে এক নারীকে। সাতক্ষীরা পৌরসভার গড়েরকান্দা এলাকার আলোচিত মাদক সম্রাজ্ঞী হিসেবে পরিচিত। ২০২৩ এবং ২০২৫ সালের পর ২০২৬ সালের আগস্টেও সাতক্ষীরা থানা পুলিশ তাকে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ পুনরায় আটক করে। এর আগে যৌথ বাহিনীর অভিযানেও তিনি তার ছেলেসহ অস্ত্র ও মাদকসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। জামিনে বের হয়ে এসে আবারও চালাতে থাকে মাদকের তার ব্যবসা। গত ৮ আগস্ট আবারও গ্রেপ্তার হয়েছে সাতক্ষীরার এই মাদক সম্রাজ্ঞী আনজুয়ারা। ২০২০ সালের ২৭ নভেম্বর সাতক্ষীরা শহরের বিনেরপোতা বাইপাস এলাকায় অভিযান চালিয়ে কাথন্ডা গ্রামের আব্দুল আজিজের স্ত্রী সুরাইয়া ইয়াছমিন (২৪) কে আটক করা হয়। আটকের সময় তার কাছ থেকে ১ কেজি ভারতীয় গাঁজা, ১৯৯টি ট্যাপেন্ডাল ট্যাবলেট, ৩০টি সিলডেনাফিল ট্যাবলেট এবং একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। ২০২৫ সালের ১১ অক্টোবর কলারোয় থেকে ২’শ পিস ইয়াবাসহ তানজিলা খাতুন (৩০) আটক করে র্যাব। সে কলারোয়া উপজেলার ঝিকরা (উত্তরপাড়া) গ্রামের আমিনুর রহমান রিংকুর স্ত্রী। এমনকি এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরে সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত মাদক মামলায় খাদিজা বেগম নামে এক নারীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড প্রদান করেন।এছাড়া, গত ৭ মার্চ খুলনার লবণচরা থানার নিজখামার এলাকা (খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়ক) থেকে সাতক্ষীরা সুরাইয়া পারভীন সুমী (৩৭) ৫টি বিদেশি পিস্তল, ২টি ম্যাগাজিন এবং ৯৬ রাউন্ড গুলিসহ আটক হয়। এই সুমী সাতক্ষীরা সদরের চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী। সে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার চালতেতলা এলাকার মৃত আশারাফ উদ্দীনের মেয়ে। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, যাত্রীবেশে যাতায়াতের সুবিধা এবং নারী দেহ তল্লাশির জটিলতাকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় ও আন্তঃজেলা গডফাদাররা অসহায় নারীদের ঠেলে দিচ্ছে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এই অপরাধে।অন্যদিকে, মাদকের এই সহজলভ্যতা ও সামাজিক নানামুখী চাপে সীমান্ত এলাকা থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে নারী মাদকাসক্তের সংখ্যা। কেবল মাদক বহনই নয়, দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে একই সঙ্গে বাড়ছে নারীদের মধ্যে মাদক সেবনের প্রবণতা। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মতে দেশে প্রায় ৩৬ লাখ এবং বেসরকারি হিসাবে প্রায় ৭০ লাখ মাদকাসক্তের একটি বড় অংশ নারী, যা মোট সংখ্যার প্রায় ১০ থেকে ১৬ শতাংশ।নারী মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের ২০১৪ সাল থেকে প্রাপ্ত উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, চিকিৎসা নেওয়া ৬৪৭ জন নারীর মধ্যে ১২৯ জনই পুরোপুরি সুস্থ হতে না পেরে পুনরায় মাদকে ফিরে এসেছেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৩ শতাংশ ইয়াবা, ২৮ শতাংশ গাঁজা, ১৬ শতাংশ ঘুমের ওষুধ এবং বাকিরা অন্যান্য মাদকে আসক্ত।অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, নারীদের মাদকে জড়িয়ে পড়া এবং পরবর্তীতে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার পেছনে রয়েছে গভীর মানসিক ও পারিবারিক সংকট। তথ্যানুযায়ী, চিকিৎসা নিতে আসা নারীদের ৩৪ শতাংশ সিজোফ্রেনিয়া, ৩০ শতাংশ মুড ডিজঅর্ডার, ১২ শতাংশ বাইপোলার ডিজঅর্ডার এবং ১০ শতাংশ ডিপ্রেশনে আক্রান্ত। পরিবারে বিচ্ছেদ, বিষণ্নতা, একাকিত্ব, মাদকাসক্ত সঙ্গীর প্রভাব কিংবা অভিভাবকদের দায়িত্বহীনতার কারণেই অধিকাংশ নারী এই পথে পা বাড়াচ্ছেন।বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের মাদক সেবনে নবজাতকের জীবন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে, আবার সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে অনেকে সময়মতো চিকিৎসা নিতেও পারছেন না। সচেতন মহলের মতে, শুধু সীমান্ত এলাকায় কিংবা পরিবহন থেকে সামান্য বেতনের নারী বাহকদের গ্রেপ্তার করে তদন্ত শেষ করলে মূল অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। বাহকরা ধরা পড়লেও নেপথ্যের অর্থদাতা ও স্থানীয় গডফাদাররা আড়ালে থেকে আবার নতুন বাহক তৈরি করে।মোটকথা, সীমান্ত অঞ্চলে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি মূল সিন্ডিকেট নির্মূল করা, নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা এবং কার্যকর মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।





























