
শেখ রিফাদ মাহমুদ:
সকালের রোদ কেবল উঁকি দিচ্ছে, চারপাশে তখনও শিশিরের রেশ কাটেনি। তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র আট বছরের ছোট্ট শিশু রাফি, পিঠে তার ভারী স্কুলব্যাগ। কিন্তু ক্লাসে যাওয়ার আগে তার প্রথম গন্তব্য বাড়ির এক কোণে থাকা ছোট একটি জামগাছের চারা। নিজের পানির বোতল থেকে পরম মমতায় কিছুটা পানি সে ঢেলে দিল চারার গোড়ায়, নিজ হাতে ঠিক করে দিল হেলে পড়া বাঁশের বেড়াটি। রাফির এই প্রতিদিনের রুটিন শুধু একটি শিশুর বৃক্ষপ্রেম নয়, এটি আসলে একটি নীরব বৈশ্বিক বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি। যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, "তুমি প্রতিদিন কেন এই কাজ করো?" তার সহজ অথচ পরিণত উত্তর ছিল, "কারণ এই গাছটির অভিভাবক আমি। ও বাঁচলে আমি শ্বাস নিতে পারব, পৃথিবীটা আর এত গরম হবে না।”
রাফির মতো এমন হাজারো শিশু আজ কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের নীরব শিকার নয়, তারাই হয়ে উঠেছে সমাধানের প্রথম সারির যোদ্ধা আমাদের পরিবর্তনের প্রকৃত প্রতিনিধি।
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন আজ কেবল বিজ্ঞানীদের সতর্কবাণী বা পাঠ্যবইয়ের কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়, এটি এক চরম রূঢ় বাস্তবতা। জাতিসংঘের শিশু তহবিল এর প্রকাশিত 'চিলড্রেনস ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স' অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে বিশ্বের প্রায় ১০০ কোটি শিশু চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের শিশুরাই রয়েছে সবচেয়ে সামনের সারিতে। তাপপ্রবাহ, আকস্মিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড় আর ঋতুচক্রের অস্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ আজ মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। উন্নত বিশ্বে যখন তরুণেরা 'ইকো-অ্যাংজাইটি' বা পরিবেশগত উদ্বেগে ভুগে প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় নামছে এবং নীতিনির্ধারকদের কাছে কেবল দাবি জানাচ্ছে, তখন গ্লোবাল সাউথের একটি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই শিশুরা কেবল সমস্যার শিকার হয়ে বসে নেই। তারা নিজেদের কাঁধেই তুলে নিয়েছে পৃথিবী বাঁচানোর এক অভাবনীয় দায়িত্ব।
আমাদের দেশে একটি বহুল প্রচলিত সংস্কৃতি হলো বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগে ঘটা করে লাখ লাখ গাছের চারা লাগানো হয়। ছবি তোলা হয়, সংবাদপত্রে খবরও ছাপা হয়। কিন্তু বছর ঘুরে দেখা যায়, অযত্ন আর অবহেলায় এর বেশিরভাগ চারা শুকিয়ে গেছে বা গবাদিপশুর খাবারে পরিণত হয়েছে। কারণ, চারা রোপণ করা হলেও তার 'মালিকানা' বা 'আজীবন দায়িত্ব' কেউ নেয় না। গাছ লাগানোর এই প্রচলিত ধারায় একটি মনস্তাত্ত্বিক শূন্যস্থান ছিল। ঠিক এই শূন্যস্থানটি অনুধাবন করেই সম্পূর্ণ নতুন এক কাঠামোগত সমাধানের পথ দেখিয়েছে এসআরআই ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন ও পিপলস ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (পিডিও)। তারা প্রবর্তন করেছে 'ট্রি গার্ডিয়ান' বা গাছের অভিভাবক কর্মসূচি।
গত কয়েক মাসে ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে নাটোরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পথচারী ও উন্মুক্ত স্থানে প্রায় ১০,০০০ গাছের চারা বিতরণ ও রোপণ করা হয়েছে। তবে এটি গতানুগতিক কোনো বৃক্ষরোপণ ছিল না। চারা তুলে দেওয়া হয়েছে একজন নির্দিষ্ট ক্ষুদে শিক্ষার্থীর হাতে। তাকে কেবল একটি চারা দেওয়া হয়নি, দেওয়া হয়েছে একটি প্রাণকে বাঁচিয়ে রাখার সর্বোচ্চ দায়িত্ব। এই প্রক্রিয়ায় ফাউন্ডেশন কাজ করেছে কেবল একটি অনুঘটক বা ক্যাটালিস্ট হিসেবে, আর মূল মঞ্চের নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে শিশুদের।
শিশুদের যখন দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখন তাদের মানসিক বিকাশে এক অদ্ভুত রূপান্তর ঘটে। মরিয়ম স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী নাবা তার গাছটির নাম দিয়েছে 'বন্ধু'। নাবা এখন জানে যে গাছ কেবল কাঠ বা ফল দেয় না, গাছ কীভাবে বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নিয়ে আমাদের চারপাশের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। এসআরআই ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে শিশুদের শুধু চারা দিয়েই ছেড়ে দেওয়া হয়নি, তাদের দেওয়া হয়েছে জলবায়ু বিষয়ক প্রাথমিক শিক্ষা। একটি শিশু যখন বুঝতে পারে যে তার হাতে থাকা ছোট চারাটি একসময় বড় হয়ে তার স্কুলমাঠকে ছায়া দেবে এবং পৃথিবীর জ্বর কমাতে সাহায্য করবে, তখন তার ভেতর এক ধরনের নেতৃত্ববোধ বা লিডারশিপ তৈরি হয়।
এই ক্ষুদে 'ট্রি গার্ডিয়ান'রা আজ তাদের পরিবার ও সমাজের জন্য এক বিশাল পরিবর্তনের প্রভাবক। যে শিশুটি নিজের গাছের যত্ন নেয়, সে তার বাবাকে অকারণে গাছ কাটতে নিষেধ করে। যে শিশুটি প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখে, সে কখনোই যত্রতত্র প্লাস্টিক ফেলে পরিবেশ দূষণ করে না। সমাজবিজ্ঞানীরা একেই বলেন 'চাইল্ড-লেড চেঞ্জ' বা শিশু-নেতৃত্বাধীন পরিবর্তন। শিশুরা যখন কোনো ভালো কাজের দায়িত্ব নেয়, তখন তার প্রভাব পুরো পরিবার এবং ধীরে ধীরে পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যখন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি ১৩: ক্লাইমেত অ্যাকশন) অর্জনের জন্য কোটি কোটি ডলারের প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়, তখন আমাদের এই ক্ষুদে 'ট্রি গার্ডিয়ান'রা কোনো বড় অর্থ ছাড়াই নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার কাজে নেমে পড়েছে। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ-এ শিশুদের একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য পরিবেশ পাওয়ার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু যখন প্রাপ্তবয়স্করা সেই নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে, তখন শিশুরাই নিজেদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হয়েছে তাদের নিজ নিজ কাজের মাধ্যমে।
একটি শিশু যখন নিজের হাতে মাটি খুঁড়ে চারা রোপণ করে এবং প্রতিদিন তার বেড়ে ওঠা পর্যবেক্ষণ করে, তখন সে আসলে প্রকৃতির সাথে এক নিবিড় আত্মিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। এই শিশুরাই আগামী দিনে যখন নীতিনির্ধারক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক বা দেশের কর্ণধার হবে, তখন পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি তাদের কাছে কোনো আরোপিত আইন হবে না; এটি হবে তাদের অন্তর্নিহিত স্বভাব। তারা জানবে কীভাবে একটি প্রাণকে পরম মমতায় বাঁচিয়ে রাখতে হয়।
পরিবর্তন একদিনে আসে না, আর একা কারো পক্ষে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন থামিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু নাটোরের এই 'ট্রি গার্ডিয়ান' মডেলটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্যই একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। এটি প্রমাণ করে যে, পরিবর্তনের প্রতিনিধি হওয়ার জন্য বয়স, অর্থ বা বড় কোনো পদবির প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন শুধু সঠিক দিকনির্দেশনা, সুযোগ এবং অকৃত্রিম সদিচ্ছার। জলবায়ু সংকটের এই চরম মুহূর্তে, যখন পুরো পৃথিবী এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমাদের আসলে প্রয়োজন এমন হাজারো রাফি বা নাবা। যারা হতাশার গল্প না শুনিয়ে, নিজেদের হাতে একটি চারা রোপণ করে বুক ফুলিয়ে বলতে পারে, "ভয় নেই, আমরা এই পৃথিবীর অভিভাবক।”
লেখক: ভিপি, কমনওয়েলথ স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন






































