
সকাল গড়াতেই আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বাড়তে থাকে রোগী ও স্বজনদের উপস্থিতি। কেউ আসছেন জ্বর-সর্দির চিকিৎসা নিতে, কেউ দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে, আবার কেউ সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে নিয়ে। বহির্বিভাগ থেকে জরুরি বিভাগ, ল্যাবরেটরি থেকে প্রসূতি সেবা—দিনভর ব্যস্ততায় কাটে হাসপাতালটির চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের।
প্রতিদিন গড়ে ১৭ থেকে ১৮শ’ মানুষ চিকিৎসা নিতে আসেন ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে। আন্তঃবিভাগে ভর্তি থাকেন প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন। সীমিত শয্যা ও জনবলের মধ্যেও বিপুলসংখ্যক মানুষকে উপজেলা পর্যায়েই চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মধ্য দিয়ে স্থানীয় মানুষের আস্থার জায়গা হয়ে উঠেছে হাসপাতালটি।
শুধু সাধারণ চিকিৎসা নয়, সময়ের সঙ্গে হাসপাতালটির সেবার পরিধিও বেড়েছে। ২৪ ঘণ্টা জরুরি চিকিৎসা, বিনা মূল্যে স্বাভাবিক প্রসব, আধুনিক আল্ট্রাসনোগ্রাফি, ডিজিটাল এক্স-রে, বিভিন্ন ধরনের রক্ত পরীক্ষা এবং যক্ষ্মা শনাক্তে জিন এক্সপার্টের মতো সেবাও মিলছে এখানে।
গুরুতর রোগী ছাড়া অধিকাংশের চিকিৎসা এখানেই:
হাসপাতালের গত এক সপ্তাহের জরুরি বিভাগের হিসাব বলছে, এ সময়ে ৯৫০ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। তাঁদের অধিকাংশকেই স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে অথবা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
প্রাথমিক চিকিৎসার পর গুরুতর ৪১ জন রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য উচ্চতর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ জরুরি বিভাগে আসা রোগীদের মাত্র প্রায় ৪ শতাংশকে উচ্চতর হাসপাতালে রেফার করতে হয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মতে, এতে বোঝা যায় গুরুতর রোগী ছাড়া অধিকাংশ মানুষকেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
এক ছাদের নিচে নানা ধরনের সেবা:
আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগে রয়েছে শিশুদের জন্য আইএমসিআই ও পুষ্টি কর্নার, নারী ও পুরুষের জেনারেল ওপিডি, ডেন্টাল কেয়ার, অল্টারনেটিভ মেডিসিন কেয়ার এবং অসংক্রামক রোগের (এনসিডি) চিকিৎসা।
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অ্যাজমা ও শ্বাসকষ্টসহ দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এনসিডি কর্নারে। জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে নিবন্ধনের পর ওষুধ মজুত থাকা সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ওষুধও বিনা মূল্যে পাচ্ছেন রোগীরা।
কৈশোরকালীন স্বাস্থ্যসেবায় রয়েছে অ্যাডোলেসেন্ট কর্নার। গর্ভবতী নারী ও সন্তান জন্মের পর মায়েদের জন্য রয়েছে এএনসি ও পিএনসি সেবা।
মেডিসিন, সার্জারি ও গাইনি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে হাসপাতালে।
প্রসূতি সেবায় বিশেষ গুরুত্ব:
হাসপাতালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রসূতি বিভাগ। কর্তৃপক্ষ বলছে, এখানে ২৪ ঘণ্টা বিনা মূল্যে স্বাভাবিক প্রসবের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতি মাসে শতাধিক স্বাভাবিক প্রসব হচ্ছে।
নারী রোগীদের জন্য নিয়মিত ভায়া (জরায়ু মুখের ক্যান্সার) পরীক্ষা করা হচ্ছে। সপ্তাহে ছয় দিন ফোরডি কালার ডপলার মেশিনে আল্ট্রাসনোগ্রাফি সেবাও দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালে প্রয়োজনীয় র্যাবিস ভ্যাকসিন, বিষধর সাপের কামড়ে ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনম এবং শিশুদের নিয়মিত টিকাসহ বিভিন্ন ভ্যাকসিন পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
আধুনিক পরীক্ষার সুবিধা:
রোগ নির্ণয়ে হাসপাতালের ল্যাবরেটরিতেও যুক্ত হয়েছে আধুনিক বিভিন্ন সুবিধা। সেল কাউন্টার, হরমোন অ্যানালাইজার, বায়োকেমিস্ট্রি অ্যানালাইজার ও ইলেকট্রোলাইট অ্যানালাইজারসহ বিভিন্ন যন্ত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।
এর পাশাপাশি রয়েছে ডিজিটাল এক্স-রে। যক্ষ্মা শনাক্তে জিন এক্সপার্ট মেশিনেও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
ফলে চিকিৎসার জন্য রোগীদের অনেক ক্ষেত্রেই উপজেলা পর্যায়েই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সীমিত জনবলেই বড় পরিসরের সেবা:
হাসপাতালটিতে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৩৯টি। বর্তমানে কর্মরত আছেন ২২ জন। সীমিত এই জনবল দিয়েই বহির্বিভাগ, আন্তঃবিভাগ, জরুরি বিভাগ, মাতৃসেবা, অ্যাডোলেসেন্ট কর্নার, আইএমসিআই কর্নার ও এনসিডি কর্নারসহ বিভিন্ন সেবা চালু রাখা হয়েছে।
আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, “সীমিত জনবল ও অবকাঠামোর মধ্যেও চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত সবাই সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে রোগীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।”
তিনি বলেন, “প্রতিদিন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি মানুষকে উপজেলা পর্যায়েই সর্বোচ্চ সেবা দিতে।”
হাসপাতালে বড় ও ছোট অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে অ্যানেস্থেসিয়া কনসালট্যান্টের পদ শূন্য থাকায় বর্তমানে মেজর সার্জারি ও সিজারিয়ান অপারেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা গেলে এসব সেবাও পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা কর্তৃপক্ষের।
মানুষের আস্থাই বড় অর্জন:
প্রতিদিন ১৭ থেকে ১৮শ’ মানুষের চিকিৎসা নেওয়া, জরুরি বিভাগে বিপুল রোগীর সেবা দেওয়া এবং গুরুতর রোগী ছাড়া অধিকাংশকেই স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়ার চিত্রটি আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওপর মানুষের আস্থারই প্রতিফলন।
৫০ শয্যার হাসপাতালটি এখন শুধু একটি চিকিৎসাকেন্দ্র নয়; উপজেলার হাজারো মানুষের কাছে এটি হয়ে উঠেছে দ্রুত, সহজলভ্য ও সরকারি স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম প্রধান ভরসার জায়গা।
রোগীর এই আস্থা ও সেবার পরিধি আরও বাড়াতে প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে আড়াইহাজারের মানুষের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবার এই কেন্দ্রটি আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।





























