
দেশের ইতিহাসে গত ২৫ বছরের সব রেকর্ড ভেঙে এক লাফে বাড়ানো হলো বিদ্যুতের দাম। পাইকারি ও খুচরা—উভয় পর্যায়েই এই নতুন মূল্যহার কার্যকর করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুতের এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির ধাক্কা শুধু বিদ্যুৎ বিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর বহুমাত্রিক প্রভাবে সামগ্রিকভাবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এক ধাক্কায় অন্তত ৬০ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে।
বিদ্যুৎ খাতের নতুন সিদ্ধান্তে পাইকারি ও খুচরা—উভয় স্তরেই দামের বড় পরিবর্তন এসেছে। নিচে এর একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
পাইকারি পর্যায়: প্রতি ইউনিটে দাম বেড়েছে ১ টাকা ৩৯ পয়সা। আগে ভারিত গড় মূল্য ছিল ৭ টাকা, যা ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে ৮ টাকা ৩৯ পয়সায়।
খুচরা পর্যায়: গ্রাহক বা ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি ইউনিটে দাম বাড়ানো হয়েছে ১ টাকা ৫২ পয়সা। ফলে গড় মূল্য ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ টাকা ৬৩ পয়সায়।
হঠাৎ করে একবারে এত বড় অঙ্কের মূল্যবৃদ্ধিকে ‘অযৌক্তিক’ ও ‘অসহনীয়’ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিস) গবেষণা পরিচালক ও প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর এ প্রসঙ্গে বলেন:
‘বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির চাপ সামলাতে গ্রাহকপর্যায়ে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ দাম বাড়ানো হলে তা হয়তো কিছুটা সহনীয় থাকত। কিন্তু একবারে এত বেশি মূল্যবৃদ্ধি মানুষের জন্য চরম অসহনীয় হয়ে পড়বে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিদ্যুতের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে সার্বিক ব্যয় বাড়ে প্রায় চার গুণ—অর্থাৎ ৪০ শতাংশ। বর্তমান বৃদ্ধির ফলে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সাধারণ মানুষ এখনো করোনা মহামারী এবং অতীতের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কাই পুরোপুরি সামাল দিয়ে উঠতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে এই নতুন দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হবে।
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়েছে দেশের উৎপাদনমুখী শিল্প খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প। বিকেএমইএ-র সভাপতি হাতেম আলী তাঁর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, এমনিতেই আগের দামে বিদ্যুৎ বিল দিতে অনেক কারখানার মালিক হিমশিম খাচ্ছিলেন। নতুন করে এই বর্ধিত ব্যয় বহন করা অনেকের পক্ষেই অসম্ভব হবে।
এর ফলে, কারখানার উৎপাদন খরচ বা উৎপাদন ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে। আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। লোকসানের মুখে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে, যার ফলে তৈরি হতে পারে তীব্র কর্মসংস্থান সংকট।
বিদ্যুতের এই নতুন মূল্যহার সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা ইতু সোম তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাজারে সবকিছুর দাম আগেই বেড়ে আকাশচুম্বী হয়েছে, এখন আবার বিদ্যুতের দাম বাড়ল। এর অজুহাতে জিনিসপত্রের দাম আরেক দফা বাড়বে। এই বাড়তি খরচ সামাল দিয়ে সংসার চালানো এখন আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
এদিকে, বিদ্যুৎ খাতের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাব (CAB)। সংগঠনের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি commission (বিইআরসি) একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে তার আইনি দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে নিয়মিত গণশুনানি হলেও, দাম কমানোর প্রস্তাব নিয়ে কখনো কেন গণশুনানি হয় না? জনগণের পক্ষ থেকে বারবার সিস্টেম লস, অপচয় ও অহেতুক ব্যয় কমিয়ে মূল্য কমানোর যৌক্তিক প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা গুরুত্ব পায় না। উল্টো বিদ্যুৎ খাতের কিছু ‘লুণ্ঠনমূলক ব্যয়’ ও অব্যবস্থাপনাকে আড়াল করতে দাম বাড়ানোর পথ সুগম করা হয়।’
বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুতের এই রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এক দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় ৬০ শতাংশ বাড়ার এই পূর্বাভাস যদি সত্যি হয়, তবে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের টিকে থাকার লড়াইটা আগামী দিনগুলোতে আরও কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়বে।







































