
আহম্মদ কবির,স্টাফ রিপোর্টার সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার হাওরাঞ্চলে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের কাজে দানবযন্ত্র এক্সক্যাভেটরের লাগামহীন ব্যবহারের কারণে প্রাকৃতিক কান্দাগুলো ক্রমেই সংকুচিত হয়ে বাঁধে রূপান্তরিত হচ্ছে। এতে হাওরের স্বাভাবিক ভূ-প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে বাঁধ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় মাটির উৎস নিয়েও দেখা দিচ্ছে গভীর সংকট।স্থানীয় কৃষক ও হাওরপাড়ের বাসিন্দাদের অভিযোগ,প্রতি বছর ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের সময় হাওরের বিভিন্ন কান্দা থেকে এক্সক্যাভেটর দিয়ে বিপুল পরিমাণ মাটি কেটে নেওয়া হয়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক কান্দা সমতল ভূমিতে পরিণত হচ্ছে বা সরাসরি বাঁধে রূপান্তরিত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের এই প্রক্রিয়ায় হাওরের প্রাকৃতিক উঁচু-নিচু ভূমির কাঠামো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা একসময় পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ও জলধারণ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।স্থানীয়দের মতে,এসব পরিবর্তনের প্রভাব কেবল প্রাকৃতিক ভারসাম্যেই সীমাবদ্ধ নয়।একসময় যেসব কান্দা হাওরের পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করত, সেগুলো এখন ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।ফলে কোথাও কোথাও পানি আটকে থাকা,আবার কোথাও দ্রুত ভাঙনের প্রবণতা দেখা দিচ্ছে।এছাড়া এসব কান্দা স্থানীয় কৃষকদের দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ গোচারণভূমি হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। বর্ষা শেষে বিস্তীর্ণ কান্দাজুড়ে গবাদিপশু চরানো হতো,যা গ্রামীণ জীবিকা ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।কিন্তু নির্বিচারে মাটি কাটার ফলে সেই প্রাকৃতিক গোচারণভূমিগুলোও এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে।এতে গবাদিপশু পালনে নতুন সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।একইসঙ্গে স্থানীয় কৃষকদের মতে,এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বর্ষা মৌসুমে বাঁধের মাটি ঢেউয়ের আঘাতে ভেঙে হাওর ও নদী-খালে জমা হচ্ছে। এতে নদী ও হাওরের তলদেশ ভরাট হয়ে পানির স্বাভাবিক ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে,যা অকাল বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।অন্যদিকে প্রতিবছর শুধু বাঁধ উঁচু করা হয় কান্দা কেটে। লামাগাঁও গ্রামের কৃষক তুহিন বলেন,একদিকে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে পানি ধারণক্ষমতা হারাচ্ছে,অন্যদিকে কান্দা কেটে বাঁধ উঁচু করা হচ্ছে। দুই দিক মিলিয়ে হাওরের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।সুলেমানপুর গ্রামের কৃষক পাবেল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,আগে হাওরের পানি কোথায় যাবে, তা প্রকৃতি ঠিক করে দিত। এখন বাঁধ দিয়ে সেই পথ বন্ধ করা হচ্ছে।বর্ষায় আবার সেই মাটিই ভেঙে নদীতে গিয়ে জমা হচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে হাওর আরও বিপদের মুখে পড়বে।জয়পুর গ্রামের এক প্রবীণ কৃষকের ভাষায়,হাওর ছিল নিজের নিয়মে চলা এক প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। এখন সেই ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। কান্দা হারালে শুধু মাটি নয়,হাওরের অস্তিত্বই ঝুঁকিতে পড়বে।পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন,হাওরের কান্দা ও নদীর তলদেশ একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র।পরিকল্পনাহীনভাবে কান্দা কেটে বাঁধ নির্মাণ করলে একদিকে যেমন মাটির উৎস সংকট তৈরি হবে, অন্যদিকে বর্ষায় সেই মাটি আবার ভেঙে গিয়ে নদী-হাওর ভরাট করে দীর্ঘমেয়াদে পানি ধারণক্ষমতা আরও কমিয়ে দেবে।এ বিষয়ে পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক পিযুষ পুরকায়স্থ টিটু বলেন,পরিকল্পিতভাবে সনাতন পদ্ধতিতে স্থানীয় শ্রমিকদের মাধ্যমে মাটি কেটে বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হলে পরিবেশের ক্ষতি কমবে।পাশাপাশি ভরাট হয়ে যাওয়া নদীর তলদেশ থেকে মাটি তুলে কান্দা পুনরুদ্ধার এবং সেখানে হিজল-করচসহ বনজ উদ্ভিদ রোপণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই বাঁধ তৈরি করা সম্ভব।তিনি আরও বলেন, এক্সক্যাভেটরনির্ভর মাটি কাটার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে শুধু কান্দাই নয়, ধান চাষের উঁচু জমিগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং পুরো হাওর ব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়বে।স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি,হাওরের কান্দা সংরক্ষণ, টেকসই প্রযুক্তিতে বাঁধ নির্মাণ এবং নদী-হাওরের প্রাকৃতিক তলদেশ রক্ষায় এখনই সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। অন্যথায় ফসল রক্ষা বাঁধই ভবিষ্যতে হাওরের জন্য নতুন পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।





























