
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের গলি। দিনের আলোতেই সেখানে পলিথিনের ছোট প্যাকেটে বিক্রি হচ্ছে ইয়াবা আর গাঁজা। ক্রেতাদের বড় অংশই স্কুল-কলেজ পড়ুয়া কিশোর কিংবা তরুণ। মোটরসাইকেলে এসে মাদক নিয়ে নিমিষেই উধাও হয়ে যাচ্ছে তারা।
এই দৃশ্য শুধু জেনেভা ক্যাম্পের নয়; বরং ঢাকা ও দেশের প্রান্তিক জনপদ পর্যন্ত এখন মাদকের ভয়াল থাবায় বন্দী। আর এই মরণনেশার হাত ধরেই জন্ম নিচ্ছে ‘কিশোর গ্যাং’ নামক এক সামাজিক ক্যান্সার।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে দেশে অপরাধের ধরন বদলে দিয়েছে মাদক। বিশেষ করে ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সীরা ইয়াবায় আসক্ত হয়ে চরম নৃশংস হয়ে উঠছে।
রাজধানীর কেরানীগঞ্জ, রায়েরবাজার, বছিলা, উত্তরা কিংবা ডেমরা; সবখানেই এখন রাজত্ব করছে কিশোর গ্যাং। তাদের হাতে থাকছে রামদা, চাপাতি আর অত্যাধুনিক সব দেশি অস্ত্র। তুচ্ছ ঘটনায় কাউকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হাত-পা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া এখন তাদের কাছে ‘বীরত্ব’।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীর পাড়া-মহল্লায় সক্রিয় থাকা এসব গ্যাং সদস্যদের নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী ‘বড় ভাই’ এবং ভূমিদস্যুরা। তারা নিজেদের পেশিশক্তি প্রদর্শনে এই কিশোরদের হাতে বইয়ের বদলে তুলে দিচ্ছে অস্ত্র ও মাদক।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল জানান, তার চেম্বারে আসা ৯০ শতাংশ মাদকাসক্ত কিশোরই জানিয়েছে, তারা বড় ভাইদের পাল্লায় পড়ে প্রথমে মাদক বিক্রি শুরু করে এবং পরে নিজেরা আসক্ত হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, নিয়মিত ইয়াবা সেবনের ফলে এই কিশোরদের মস্তিষ্ক থেকে মায়া-মমতা বা আবেগ মুছে যায়। তারা হয়ে ওঠে চরম নিষ্ঠুর ও অনুভূতিহীন খুনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের কঠোর নির্দেশের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চিরুনি অভিযান শুরু করলেও মাঠ পর্যায়ে এর প্রভাব এখনো সেভাবে দৃশ্যমান নয়।
পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দাবি, অভিযানে প্রতিদিন অনেক অপরাধী ধরা পড়ছে। কিন্তু রাজধানীর বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী ‘বড় ভাইদের’ ইশারায় এই কিশোর অপরাধীরা আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে দ্রুতই জামিনে বেরিয়ে আসছে এবং দ্বিগুণ উৎসাহে পুনরায় মাদক ও সড়কে চাঁদাবাজিতেও লিপ্ত হচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ সরাসরি চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে বলেন, সীমান্ত দিয়ে ইয়াবার প্রবেশ ঠেকানো না গেলে শুধু জনবল দিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে পরিমাণ মাদক উদ্ধার করে, তা দেশে প্রবেশ করা মোট মাদকের তুলনায় সাগরে এক ফোঁটা পানির মতো।
সাবেক আইজিপি মো. নূরুল হুদা জানান, মাদক নির্মূলে সিঙ্গাপুর বা থাইল্যান্ডের মতো কঠোর আইন ও তার দ্রুত প্রয়োগ জরুরি। সেসব দেশে মাদক ব্যবসার সাজা মৃত্যুদণ্ড হওয়ায় তারা মাদকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে। বাংলাদেশেও মাদকের উৎস এবং নেপথ্যে থাকা ‘হোতা’দের বিরুদ্ধে আপসহীন ব্যবস্থা না নিলে এই কিশোর সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, সমাজে মাদকের যত বেশি সহজলভ্যতা থাকবে, মাদকাসক্ত ব্যক্তির সংখ্যাও তত বাড়বে। সেই সঙ্গে বাড়বে অপরাধ প্রবণতা।







































