
বদরুল আমীন, ময়মনসিংহ ঃ নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার জারিয়া ইউনিয়নের মাইজপাড়া ও দুর্গাপুর উপজেলার নগুয়া গ্রামের মধ্যবর্তী কংস নদী থেকে অনুমতিবিহীন অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলন করছে। স্থানীয়দের দাবি, গত ১০ থেকে ১৫ দিন ধরে একটি ব্যবসায়ী মহল বালু উত্তোলনকারী ড্রেজারজাতীয় যন্ত্র ব্যবহার করে ওই স্থান থেকে দিবা-রাত্র বালু উত্তোলন করে আসছে। স্থানীয়দের হিসাবে ইতোমধ্যে প্রায় অর্ধকোটি টাকার বালু উত্তোলন করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় এলাকাবাসী ও সচেতন মহলের পক্ষ থেকে মঙ্গলবার সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক, পূর্বধলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং দুর্গাপুরের ইউএনওর হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত অভিযোগ পাঠানো হয়। অভিযোগের সঙ্গে প্রায় ৫৯ সেকেন্ডের একটি ভিডিওচিত্রও সংযুক্ত করা হয়। ঘটনাস্থলটি পূর্বধলার জারিয়া ইউনিয়নের মাইজপাড়া ও দুর্গাপুর উপজেলার নগুয়া গ্রামের মধ্যবর্তী কংস নদী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বালু উত্তোলন কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। ফলে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে লিখিত অভিযোগ ও ভিডিওচিত্র পাঠানোর পরও কেন তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে সরেজমিন যাচাই বা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলো না—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
‘আমি নতুন এসেছি, খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছি’
অভিযোগ পাওয়ার পর গতকাল পূর্বধলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) স্থানীয় তথ্যদাতাকে বলেন, “আমি এখানে নতুন এসেছি—তারপরও খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছি।” তবে সন্ধ্যায় পূর্বধলার ইউএনওর পক্ষ থেকে হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় জানানো হয়, পূর্বধলা উপজেলায় কংস নদী নেই; নদীটি দুর্গাপুর উপজেলার সীমানায়। এ সময় অভিযোগকারী তথ্যদাতা জানতে চান, বিষয়টি দুর্গাপুর উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে কি না কিংবা সকালে পাঠানো অভিযোগটি দুর্গাপুর প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে কি না। জবাবে তাঁকে দুর্গাপুরের ইউএনওর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ঠিক আছে—দেখছি !
পরে দুর্গাপুরের ইউএনওর কাছে সকালে পাঠানো অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কোথায় পাঠিয়েছেন, হোয়াটসঅ্যাপে ঠিক আছে—দেখছি।”
ফলে অভিযোগের স্থানটি কোন উপজেলা প্রশাসনের সরাসরি আওতাধীন এবং অভিযোগটি কে সরেজমিনে যাচাই করবে—এ বিষয়ে দিনের শেষ পর্যন্ত স্পষ্টতা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।
বালু উত্তোলনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন:
অভিযোগে বলা হয়েছে, মাইজপাড়া-নগুয়া এলাকার মধ্যবর্তী কংস নদী থেকে বালু উত্তোলনের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী মহলের কোনো বৈধ ইজারা বা সরকারি অনুমোদন রয়েছে কি না, তা স্থানীয়দের জানা নেই। ব্যবহৃত বালু উত্তোলনকারী যন্ত্রটির মালিক গন্ডাবেড় গ্রামের মানিক মিয়া বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিতি রয়েছে—এমন তথ্যও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে যন্ত্রটির প্রকৃত মালিকানা, বালু উত্তোলনের সঙ্গে কারা জড়িত এবং সংশ্লিষ্ট কোনো বৈধ ইজারা বা অনুমোদন রয়েছে কি না—এসব তথ্য এখনো প্রশাসনিকভাবে যাচাই করা হয়নি। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী, নদীর তলদেশের কোনো স্থান বালুমহাল হিসেবে ঘোষণা করতে নির্দিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। আইনে সংশ্লিষ্ট রাজস্ব কর্মকর্তার পরিদর্শন, ট্রেসম্যাপ ও তফসিলসহ প্রতিবেদন এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের বিধান রয়েছে। একই আইনে বালুমহাল ইজারা উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে দেওয়ার বিধান রয়েছে এবং ইজারা চুক্তিতে বালুমহালের সুনির্দিষ্ট বিবরণ ও শর্ত উল্লেখ করার কথা বলা হয়েছে।
ফলে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে শুধু বালু উত্তোলন হচ্ছে কি না, তা দেখাই যথেষ্ট নয়; সংশ্লিষ্ট নদীর ওই নির্দিষ্ট অংশটি আদৌ ঘোষিত বালুমহাল কি না, থাকলে সেটির ইজারা কার নামে, ইজারার সীমানা কতটুকু এবং সেখানে বালু উত্তোলনের পদ্ধতি ও শর্ত কী—এসব বিষয়ও নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রায় কোটি টাকার বালু উত্তোলনের দাবিঃ
স্থানীয়দের দাবি, গত ১০ থেকে ১৫ দিনে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন ও বিক্রি করা হয়েছে। তাদের হিসাবে এর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় অর্ধকোটি টাকা। তবে উত্তোলিত বালুর প্রকৃত পরিমাণ, বিক্রয়মূল্য এবং এর মাধ্যমে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। সরেজমিন পরিমাপ ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই ছাড়া এ দাবির সত্যতা নিশ্চিত করাও সম্ভব নয়।
৩৫ লাখ টাকা দেওয়ার অভিযোগ:
স্থানীয় পর্যায়ে আরও একটি গুরুতর অভিযোগের কথাও শোনা যাচ্ছে। স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য, অভিযুক্ত বালু উত্তোলনকারীদের পক্ষ থেকে দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা দেওয়ার কথা তারা শুনেছেন। তবে এ দাবির পক্ষে প্রতিবেদকের কাছে কোনো নথি, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ বা প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি স্বাধীনভাবেও যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে ৩৫ লাখ টাকা দেওয়ার অভিযোগকে কোনোভাবেই প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি বর্তমানে স্থানীয় পর্যায়ে প্রচলিত একটি অভিযোগ মাত্র। এ বিষয়ে দুর্গাপুরের ইউএনওর বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি সকালে পাঠানো অভিযোগটি হোয়াটসঅ্যাপে পেয়েছেন কি না, তা দেখে জানানোর কথা বলেন। তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ বিষয়ে তাঁর কোনো বক্তব্য এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি। এদিকে নেত্রকোনার জেলা প্রশাসকের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের পরও কেন নেই কোন কার্যক্রম?
এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—মঙ্গলবার সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে লিখিত অভিযোগ ও ভিডিওচিত্র পাঠানোর পরও যদি দিনভর বালু উত্তোলন চলতে থাকে, তাহলে অভিযোগটি প্রশাসনিকভাবে কীভাবে গ্রহণ বা যাচাই করা হয়েছে? অভিযোগের স্থান যদি বৈধ বালুমহালের আওতাভুক্ত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ইজারা, সীমানা ও উত্তোলনের শর্ত নথিপত্রের মাধ্যমে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। আর যদি বৈধ ইজারা বা অনুমোদন না থাকে, তাহলে অভিযোগ পাওয়ার পরও কেন কার্যক্রম বন্ধ হয়নি—সেটিও প্রশাসনিকভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একইভাবে, ব্যবহৃত ড্রেজার বা বালু উত্তোলনকারী যন্ত্রের ধরন এবং সেটির ব্যবহার আইন ও সংশ্লিষ্ট অনুমোদনের শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তাও তদন্তের অংশ হওয়া প্রয়োজন।





























